Home » জাতীয় » এসএসএফকে আধুনিক প্রযুক্তি জ্ঞান সম্পন্ন হতে হবে : প্রধানমন্ত্রী

এসএসএফকে আধুনিক প্রযুক্তি জ্ঞান সম্পন্ন হতে হবে : প্রধানমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক, নিউটার্ন.কম ১৬ জুন : প্রযুক্তির উৎকর্ষতার এই যুগে অপরাধের ধরণ পাল্টাতে থাকায় একে মোকাবিলার জন্য স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স (এসএসএফ) সদস্যদের আধুনিক প্রযুক্তি জ্ঞান সম্পন্ন হয়ে গড়ে ওঠার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘অপরাধীদের নতুন প্রযুক্তিগত দক্ষতাকে মোকাবিলা করার জন্য এসএসএফ সদস্যদের আরো পারদর্শী হওয়া দরকার এবং সেইদিক থেকেও আমাদেরকে যুগোপযোগী থাকতে হবে।’

প্রতিটি জিনিসের ভাল ও খারাপ দুটি দিকই থাকে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘প্রতিনিয়ত সন্ত্রাসের ধরণ বদলাচ্ছে, নতুন প্রযুক্তি যেমন উন্নয়নের যাত্রাপথকে সুগম ও গতিশীল করে দেয় তেমনি একইভাবে যারা সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ, অসামাজিক কাজসহ নানা অপরাধে সম্পৃক্ত তাদের ক্ষেত্রেও নতুন সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়।’

শনিবার দুপুরে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে এসএসএফ অফিসার্স মেস-এ এসএসএফ’র ৩৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।

এসএসএফ’র মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. মজিবুর রহমান অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তৃতা করেন এবং এই বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনীর বিভিন্ন কর্মকাণ্ড তুলে ধরেন।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এই যুগে মানুষের জীবনে প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধির প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, ‘নতুন নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন হওয়ায় আমাদের জীবন-মানের উন্নয়ন ঘটছে, জীবনযাত্রাকে অগ্রগামী করছে, উন্নয়নের ধারাকে অগ্রগামী করছে পাশাপাশি নানা ধরনের ঝুঁকিরও সৃষ্টি করছে।’

তিনি এ সময় এসএসএফ সদস্যদের আধুনিক প্রযুক্তি জ্ঞান সম্পন্ন হয়ে গড়ে উঠে এই প্রযুক্তিকে যারা মন্দ কাজে ব্যবহার করছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান।

সরকার প্রধান বলেন, ‘এসএসএফকে আধুনিক প্রযুক্তি জ্ঞান সম্পন্ন হতে হবে। এই বাহিনীতে নতুন নতুন প্রযুক্তির সন্নিবেশ যেমন ঘটাতে হবে তেমনি প্রযুক্তির উৎকর্ষতায় অপরাধের পরিবর্তিত অবস্থা সম্পর্কেও তাদের প্রশিক্ষণ থাকতে হবে। আর সেইসাথে যে কোনো অবস্থা মোকাবিলার সরঞ্জামাদিও দরকার।’

‘তাই যখন যেটা প্রয়োজন সেটার ব্যবস্থা আমরা করছি। ক্ষেত্র বিশেষে নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়েও তা করা হচ্ছে,’ যোগ করেন তিনি।

প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, ‘যুগোপযোগী প্রশিক্ষণ এজন্য সব সময় গুরুত্বপূর্ণ বলে আমি মনে করি।’

প্রধানমন্ত্রী এ সময় মহাকাশে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণ, নিজস্ব পারমাণবিক বিদ্যুতকেন্দ্র গড়ে তোলা, আন্তর্জাতিক বিশ্বের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন। তিনি দেশি ও আন্তর্জাতিক বিশ্বের যে কোনো প্রকার ষড়যন্ত্র মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকার জন্যও এসএসএফ সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানান।

সরকার প্রধান বলেন, ‘আমাদের স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি বা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে যারা আমাদের সমর্থন দেয়নি তাদের চক্রান্ত, কুটিলতা, জটিলতা থাকবে। কিন্তু সেগুলো মোকাবিলায় আমাদের সব সময় প্রস্তুত থাকতে হবে। এজন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিও নিতে হবে এবং সকলে সচেতন থাকবে, সেটাই আমরা চাই।’

এ সময় তিনি মাদকের ভয়াবহতা রোধকল্পে সবাইকে সচেতন থাকার আহ্বান জানান।

দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধান এবং সরকার কতৃর্ক ঘোষিত অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির নিরাপত্তার জন্য ১৯৮৬ সালে রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তা বাহিনী গঠিত হয়। পরবর্তী সময়ে এই বাহিনীকে স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স হিসেবে নতুন নামকরণ করা হয়। বাংলাদেশ সেনা, নৌ, বিমান, পুলিশ ও আনসার বাহিনী থেকে প্রেষণে নিযুক্ত অফিসারদের নিয়ে এসএসএফ গঠিত হয়ে থাকে।

রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে এবং নানা প্রতিকূল পরিস্থিতিতে এসএসএফ সদস্যদের কাজ ও তাদের কর্তব্যনিষ্ঠার ভূয়সী প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশের যে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তাতে ’৭৫ সালে জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যার পর ১৯ বার ক্যু হয়েছে, নানা ধরনের রাজনৈতিক সহিংসতা ঘটেছে। জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাসের উত্থান ঘটেছে। বার বার নানা প্রতিকূল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এসব চক্রান্ত মোকাবিলা করে দেশের গুরুত্বপূর্ণ মানুষদের নিরাপত্তা দেওয়া- এটা একটা কঠিন চ্যালেঞ্জ।’

‘তবে, আমি এটুকু বলবো যে, এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের এসএসএফ সব সময়ই অত্যন্ত দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেছে’, যোগ করেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি এই বাহিনীর সদস্যদের অত্যন্ত দৃঢ় মনোবল দেখেছি এবং তাদের আনুগত্য এবং উচ্চমানের পেশাদারিত্ব আমাকে সত্যিই গর্বিত করেছে।’

বিদেশ থেকে আগত অতিথিরাও এসএসএফ সদস্যদের দায়িত্ব পালনের প্রশংসা করেছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমাদের এসএসএফ সদস্যরা তাদের দক্ষ পেশাদারিত্বের মাধ্যমে সব সময় দেশের ভাবমূর্তিকে সমুন্নত রেখেছেন।’

ভিআইপিদের নিরাপত্তাসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের নিরাপত্তা বিধানে প্রয়োজনে জীবনের ঝুঁকি নিয়েও দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখায় তিনি এসএসএফ সদস্যদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানান।

নিজেকে নিয়ে নয় বরং তার আশেপাশে যারা নিরাপত্তা রক্ষায় নিয়োজিত থাকেন তাদেরকে নিয়েই তার সব সময় চিন্তা হয় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী সবার উন্নতি ও সমৃদ্ধি এবং নিরাপদ জীবন কামনা করেন।

তিনি বলেন, ‘কতক্ষণ আছি জানি না। তবে, যে সময়টুকু পাব আমি দেশের জন্য কাজ করে যাব। নিজেকে নিয়ে বেশি চিন্তা করি না কারণ, আমার ভাগ্যে যা আছে তা ঘটবে। তোমাদের জন্যই (যারা নিরাপত্তায় নিয়োজিত) আমার চিন্তা, আল্লাহ তোমাদের হেফাজত করুন।’

তিনি এসএসএফ সদস্যদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কল্যাণ কামনা করে বলেন, ‘আমি চাই এই বাহিনীটা একটা আদর্শ নিরাপত্তা বাহিনী হিসেবে যেভাবে গড়ে উঠছে সেভাবে এটা গড়ে উঠে দেশ ও জাতির মুখ উজ্জ্বল করবে।’

দেশের উন্নয়ন নিশ্চিত করতে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘একটি শান্তিপূর্ণ অবস্থান না হলে দেশের উন্নতি করা সম্ভব নয়। যদিও অনেক ঝড়-ঝাপটা এসেছে সেগুলোকে মোকাবিলা করেই দেশকে আমরা উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি।’

তিনি বলেন, ‘প্রবৃদ্ধির হার ৮ ভাগে উন্নীত করেছি, যা এক সময় কেউ চিন্তাও করতে পারতো না।’

অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশ আজ এগিয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সারা বিশ্বে আজকে বাংলাদেশের একটি মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান সৃষ্টি হয়েছে। সেই সঙ্গে আমাদের কর্ম পরিধিও বেড়েছে। কারণ, এবারে আমরা ৫ লাখ কোটি টাকার ওপরে বাজেট দিয়েছি।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যেখানে ৬১ হাজার কোটি টাকার বাজেট ছিল তা এক দশকের মধ্যেই ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকায় তুলে আনা এবং সেটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা অত্যন্ত কঠিন কাজ। তবে, দেশে স্থিতিশীলতা বজায় থাকাতেই এটা সম্ভব হয়েছে।’

দেশের জনগণ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থা অত্যন্ত দক্ষতা ও আন্তরিকতার সঙ্গে সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদসহ নানা প্রতিকূলতা মোকাবিলা করেছে বলেই দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে অব্যাহত রাখা সম্ভব হয়েছে বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, ‘সরকারের ধারাবাহিকতা থাকলে এবং সততার সঙ্গে যদি কাজ করা যায় তাহলে একটা দেশকে যে উন্নত করা যায় সেটা আমরা গত এক দশকে প্রমাণ করেছি।’

অবশ্য জাতির জীবনে ’৭৫ এর কালো রাত না এলে বাংলাদেশ আরো আগেই এই সক্ষমতা অর্জনে সমর্থ হত বলেও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

শেখ হাসিনা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় জাতির পিতার স্বপ্নের সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে দেশবাসীকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘লাখো শহীদের রক্তে অর্জিত স্বাধীনতা যেন কোনোভাবেই ব্যর্থ না হয়, মুক্তিযুদ্ধে আমাদের বিজয়ের ইতিহাস কেউ যেন ভুলে না যায়।’

তিনি বলেন, ‘দেশকে যেন আমরা এগিয়ে নিয়ে যেতে পারি এবং আন্তর্জাতিকভাবে দেশের ভাবমূর্তি যেন বৃদ্ধি পায় সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে।’

প্রধানমন্ত্রী তার সাম্প্রতিক ত্রিদেশীয় সফরের সময় সৌদি আরবে ওআইসি সম্মেলনে যোগ দিয়ে ভাতৃত্ববোধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে মুসলিম দেশগুলোকে সন্ত্রাস এবং জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন- সে বিষয়টিও উল্লেখ করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘শান্তির ধর্ম ইসলামে সন্ত্রাসের কোন স্থান নেই এবং মহান আল্লাহ শেষ বিচারের মালিক, কে ভাল মুসলমান, কে ভাল নয়, সেটা নির্ণয়ের দায়িত্ব তিনি কাউকে দেননি। তাহলে আজকে মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে কেন এত সংঘাত, খুনোখুনি, রক্তারক্তি। কেন সমস্যাগুলি নিজেরা বসে আমরা সমাধান করতে পারি না।’

মুসলমানদের এই রক্তপাতে লাভবান হচ্ছে কেবল অস্ত্র ব্যবসায়ীরা উল্লেখ করে তিনি এই সংঘাত বন্ধে ওআইসিকে ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, ‘আমি জানি এই কথা বলে আমি আমার জীবনকে আরো ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছি। এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ছাড়া কাউকে ভয় করি না। একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কারো কাছে মাথা নত করি না, আমার বাবাও যেটা করেননি।’

জাতির পিতার দিয়ে যাওয়া পররাষ্ট্রনীতি ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়’ অনুসরণ করেই তিনি সরকার পরিচালনা করছেন উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা সকলকে নিয়ে একটা শত্রুই নির্দিষ্ট করতে চাই, সেটা হচ্ছে দারিদ্র। যেটা সমগ্র বিশ্বের একটি কমন এনিমি।’

মন্ত্রি পরিষদ সদস্য, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, তিন বাহিনী প্রধান, মুখ্য সচিব, সংশ্লিষ্ট সচিব, পদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা এবং এসএসএফ- এর সদস্যরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

তথ্যসূত্র : বাসস।

নিউটার্ন.কম/এআর

0 Shares