Home » মতামত » এ কোন দুঃসময়

এ কোন দুঃসময়

 

মানুষ স্বভাবতই নৈতিক। কারণ জৈবিক প্রবণতার পাশাপাশি মানুষের রয়েছে বৈদ্ধিক প্রবণতা যা বিবেকের প্রতিনিধিত্ব করে, ন্যায়-অন্যায় বোধ জাগ্রত করে। মানুষের ইচ্ছালব্ধ প্রবণতা যখন নঙর্থক কাজের মাধ্যমে প্রকাশিত হয় তখন হয় “পাপ”। “পাপ” ও “অপরাধ” এক নয়; যে পাপ সমাজের বিরুদ্ধে করা হয় এবং যার জন্য রাষ্ট্র দণ্ড দেয় তা-ই “অপরাধ”। এই অর্থে ‘ধর্ষণ’ এক জঘন্যতম “অপরাধ”। আর যদি হয় ‘শিশু ধর্ষণ’ তবে ঘৃণা প্রকাশের শব্দ নির্ধারণও কঠিন হয়ে পড়ে। ভাবতে হবে নৈতিক স্খলনের কত নিম্ন স্তরে অবস্থান করছি আমরা।
‘শিশু ধর্ষণ’ কথাটি ভাবতেই মন লজ্জায়-কষ্টে মুর্ষিত হতে হয়। অথচ শিশু ধর্ষণ ও হত্যা যেন নৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। গত ০৭/০৭/১৯ তারিখে প্রথম আলো পত্রিকায় প্রকাশিত ৭ বছরের শিশু সায়মা ধর্ষণ ও হত্যার খবরটি এক ঝটকায় নিজের ঐ বয়সি মেয়েটির মুখ মনে করিয়ে দিল। প্রচণ্ড খারাপ লাগা নিয়ে ভয়ে আশংকিত হলাম । স্কুলে, কোচিং এ বেড়াতে গিয়ে কিংবা নিজ বাসায় আমার মেয়েটা নিরাপদে, সুস্থতায় থাকবে তো? এ কোন দুঃসময় পার করছি আমরা? নুশরাত বিভীষিকা কাটতে না কাটতেই সায়মাসহ আরো দুই শিশু (৬ ও ৭ বছরের) ধর্ষণ। যখন এ কথা লিখছি হয়তো তখনও আরো কোনো মেয়ের জীবনে ঘটে গেছে এরকম নারকীয় বিভীষিকা। পত্রিকার পাতায় সব ঘটনাতো খবর হয়ে আসে না। কত ঘটনাইতো গভীর ক্ষত আর নিরব চোখের জলে চাপা পড়ে যায় পারিবারিক আর সামাজিক সম্মান রক্ষার্থে।
গণ্ডিবদ্ধ শহুরে জীবন আর পড়ালেখার ব্যাপকচাপে শিশুদের বাঁধাহীন আনন্দময় শৈশবতো আমরা দিতে পারছিই না উপরন্তু খেলতে গিয়ে ফিরেতে হচ্ছে ধর্ষিত লাশ হয়ে। সায়মা আকাশ দেখতে ছাদে যেতে চেয়েছিল আজ নিজেই জ্বলজ্বলে নক্ষত্র হয়ে রয়েছে পুরো আকাশময়। সায়মার মায়ের আহাজারিতে চোখের পানি আটকে রাখতে পারছি না।
দূরবর্তী আত্মীয়, শুভাকাক্ষিরা সতর্ক করে “মেয়েকে সাবধানে রেখো, কারো ডাকে কোথাও যেন একা না যায়, এমনকি শিক্ষক ডাকলেও না।”ধরে-বেঁধে আটকে জড়বৎ অপ্রকৃতিস্থ করে কি শিশু সন্তান মানুষ করা যায়? একজন সুস্থ স্বাভাবিক শিশুকে যদি আশপাশের সবার সম্পর্কে ক্রমাগত সাবধান করতে থাকি তাহলে কি হবে ওর মানসিক অবস্থা? মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যায় বলে একটা ভীতসন্ত্রস্ত  ব্যক্তিত্ব তৈরি হবে শিশুটির যার স্বাভাবিক শৈশব জীবন বলে কিছুই থাকবে না। কৌতূহলী শিশু মন নিয়ে ৭ বছরের মেয়ে আমার পত্রিকা পড়ে বিষ্মিত চোখে প্রশ্ন করে “মা, ধর্ষণ কি? মেয়েটাকে মেরে ফেলল কেন?” উত্তর দিতে কণ্ঠ রুদ্ধ হয়। আজ একটা মেয়ের জন্য কোন সম্পর্কই সন্দেহাতীত নয়, এমনকি শিক্ষকের নিবিড় স্নেহও। অথচ কি আনন্দময় শৈশব কাটিয়েছি । যেখানে এমন অপ্রস্তুত করা ভীতিকর খবর ছিল না। পেশায় শিক্ষক বলেই যখন শুনি শিক্ষক দ্বারা ছাত্রী ধর্ষিত হয় তখন লজ্জায় মাথা নিচু হয়ে যায়। নিজ গৃহ থেকে শুরু করে কোন জায়গায়ই মেয়ে শিশুর জন্য নিরাপদ আশ্রয় নয়।
কানাডা প্রবাসী এক বান্ধবী কথাচ্ছলে বলল, “বাংলাদেশের পত্রিকা পড়লে ধর্ষণের খবরে শরীর গুলিয়ে ওঠে। ভাগ্যিস মেয়েদের নিয়ে দেশ ছেড়ে চলে আসতে পেরেছিলাম।”টনটনে দেশাত্ববোধ নিয়ে বলি, “কেন সে দেশে কি সামাজিক অপরাধ হয় না।” সে আরো তীব্রতায় বলল,“তা নয়, তবে অন্যায়ের বিচার ঘটে চোখের পলকেই, এটাই শান্তি।” এবার কণ্ঠস্বর ম্রিয়মান হলো আমার। গত ১০/০৭/১৯ তারিখের প্রথম আলো পত্রিকায় প্রকাশিত ধর্ষণ বিষয়ক পরিসংখ্যান চোখের সামনে স্পষ্ট হলো । ২০১৯ সালের প্রথম ছয় মাসে শিশু ধর্ষণ ৬৩০টি, ধর্ষণ জনিত হত্যা ২১টি। এ বিষয়ে মামলা হয়েছে ৩০০ এর কিছু বেশি। যার অধিকাংশ নিষ্পত্তির কিংবা সাজা হবার সঠিক হিসাব জানা যায় নি। এ রকম হতাশাজনক পরিস্থিতিতে মেয়ে শিশুসহ সকল নারীর জীবনই আশংকিত।
কি কারণে বাড়ছে এই বিকৃত মানসিকতা তার অনুসন্ধানে প্রথমেই ফ্রয়েডিও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে পাওয়া যায়- শৈশবের অবদমিত ইচ্ছা আর বাধাগ্রগ্রস্ত মানসিক প্রবণতাগুলিই পরবর্তীতে ধর্ষণকামি মনোভাবসহ অপরাপর কুপ্রবণতা ও অপরাধের জন্ম দেয়। কিন্তু শুধু মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণই যথেষ্ট নয় বরং আরো কিছু কারণ সুষ্পষ্ট। সর্বাগ্রে বলতে হয় প্রযুক্তির অবাধ ব্যবহারের কথা যার সুপ্রভাব যেমন অনস্বীকার্য তেমন কুপ্রভাবের তীব্রতাও ব্যাপকভাবে প্রমাণিত। বইত্যাদির বাধাহীন ব্যবহার সহজলভ্য করেছে পর্ণগ্রাফিসহ সকল বিজাতীয় অশ্লীল সংস্কৃতিকে। শিশু-কিশোরদের চলনে-বলনে, পোশাকে, চিন্তায় লক্ষ্যণীয় হচ্ছে উগ্রতা ও বিকৃত রুচি যা উৎসাহিত করছে ধর্ষণসহ অপরাপর সামাজিক অপরাধ। স্মার্ট ফোন আমাদের যতটা স্মার্ট করছে তার চেয়ে বেশি আত্মিক, ব্যক্তিক ও নৈতিক অধঃপাত ঘটাচ্ছে নিশ্চিতভাবে।
সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রাষ্ট্রীয় আইনের শাসনের দুর্বলতা ও বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা। শুধু তাই নয় মাদকের ব্যবহার, প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রভাব ও হুমকি ইত্যাদি বিষয় ধর্ষণসহ নানাবিধ সামাজিক অপকর্মের পূনরাবৃত্তি ঘটাচ্ছে।
বর্তমান অধঃপতিত সামাজিক বাস্তবতায় প্রয়োজন, দ্রুত অপরাধ প্রবণতাকে রুখে দেওয়া। তাই অবিলম্বে শিশু কিশোরদের স্মার্ট ফোনসহ অন্যান্য প্রযুক্তির অবাধ ব্যবহারের বয়সভিত্তিক নিষেধাজ্ঞা প্রয়োজন। সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আইনের আওতায় বিচারাধীন মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি ও অপরাধির শাস্তি নিশ্চিত করা। সাধারণ মানুষ অন্যায় রুখতে রাষ্ট্রীয় আইনের শক্তিশালী আশ্রয় প্রার্থনা করে। এটির অভাবেই আজ সাধারণের প্রতিবাদের ভাষাও দুর্বল। তাই রাষ্ট্রকে তথা সরকারকেই শক্তি ও ভরসার জায়গাটি নিশ্চিত করতে হবে। চরিত্র গঠন ও মানবিক বোধের ভীত পরিবারই তৈরি করে দেয়। সে অর্থে পারিবারিক অনুশাসন তথা অভিভাবকের সচেতনতা ও ধর্মীয় বোধের চর্চা সর্বাধিক জরুরি। শুধু তাই নয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সামাজিক পর্যায়ে অপরাধ প্রবণতা ও ধর্ষণের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রচারণা ও কাউন্সিলিং দরকার। শিক্ষার কারিকুলাম ও সিলেবাসে স্কুল পর্যায় হতেই নৈতিক শিক্ষার ও যৌন শিক্ষার স্বচ্ছ ধারণাটি সংযোজন প্রয়োজন। মানুষের বিবেকবোধের উন্নয়ন ও সচেতনতাই পারে সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে শক্তিশালী হাতিয়ার হয় উঠতে।

লেখক : লাইলা পারভীন চম্পা
সহকারী অধ্যাপক
দর্শন বভিাগ
সরকারি এম.এম. সিটি কলজে, খুলনা।

0 Shares